
বিষয়ঃ মৃত্যু-কবর-কেয়ামত-হাশর-পুলসিরাত-জান্নাত-জাহান্নাম।
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ। প্রিয় পরিণতি চ্যানেলের শ্রোতা বন্ধুরা আশা করছি মহান রব্বুল আলামীনের অশেষ রহমতে আপনারা সবাই ভালো ও সুস্থ আছেন। হাশরের ময়দানে প্রত্যেককেই একটি করে পুস্তিকা দেয়া হবে। যাতে দুনিয়াতে তার সকল কৃতকর্মের বিবরণ লিখিত থাকবে। বলা হবে আমার কাছে রক্ষিত আমলনামা তোমাদের সম্পর্কে সত্য কথা বলবে। তোমরা যা করতে আমি তা লিপিবদ্ধ করতাম। তবে কি সেই আমলনামা? কি লেখা থাকবে তাতে? মানুষ তা কিভাবে গ্রহণ করবে? প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই লিখিত আমলনামা থাকবে। তাতে তার ভালোমন্দ সকল কর্মলিপিবদ্ধ থাকবে। সেখানে তার ছোট বড় সকল কৃতকর্মের বিবরণ থাকবে। হাশরের ময়দানে প্রত্যেককে নিজের আমলনামা দেখতে পাঠ করতে দেয়া হবে। তবে আমলনামা বিতরণের প্রক্রিয়া হবে ভিন্ন। মুমিনদেরকে সহজ হিসাব নেয়ার পর তাদের আমলনামা সামনের দিকে দিয়ে ডান হাতে দেয়া হবে। আমলনামা পেয়ে সে যারপর নাই খুশি হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে আসবে। পক্ষান্তরে অপরাধী মুনাফিকদের আমলনামা পিঠের পেছন দিক থেকে বাম হাতে দেয়া হবে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে তাদের আমলনামা করা বিতরণ হবে। আল্লাহ বলেন, যখন আমলনামা খোলা হবে, প্রত্যেক মানুষকে আমলনামায় লিপিবদ্ধ নথি অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া হবে। আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গৃবালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের করে দেখাবো তাকে একটি কিতাব যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ করো তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি যথেষ্ট। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমলনামা পাঠ করে নিজেদের পরিণাম স্থল বুঝতে পারবে। সহজে হিসাব গ্রহণের পর তারা পরিবারের কাছে অত্যন্ত খুশি ও সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে আসবে। সব ভয় দূর হয়ে যাবে। আনন্দে হৃদয় ভরে উঠবে। মানুষের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, এরপর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে সে বলবে নাও তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখো। আমি জানতাম যে আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। তারপর সে সুখে জীবন যাপন করবে। সুচ্চ জান্নাতে তার ফল সমূহ অবনমিত থাকবে। বিগত দিনে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে তার প্রতিদনে তোমরা খাও এবং পান করো তৃপ্তি সহকারে। ক্ষতিগ্রস্ত পাপিষ্ঠ যারা জীবনকে হেলাফেলায় নষ্ট করেছে পরকাল ধ্বংস করেছে তাদের চেহারা হবে সেদিন কালো আল্লাহ বলেন এবং যাকে তার আমলনামা পিঠের পশ্চাৎ দিক থেকে দেয়া হবে সে মৃত্যু আহ্বান করবে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করবে অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে হায় যদি আমাকে আমার আমলনামা না দেয়া হতো আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব আমার মৃত্যু যদি শেষ হতো আমার ধন সম্পদ আমার কোন উপকারে আসলো না আমার ক্ষমতা বরবাদ হয়ে গেল সেদিন মুমিনদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম বলেন এরপর তার সৎকর্মের আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে অক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফিকদেরকে সকল সৃষ্টির সামনে ডেকে বলা হবে এরাই সেসব লোক যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে ছিল। শুনে রাখো জালেমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাদ রয়েছে। মানুষ যখন তাদের আমলনামা গ্রহণ করবে তখন থেকেই তাদের উপস্থিতি ও হিসাব কার্য শুরু হবে। পাশাপাশি আমলনামা ওজন করা সিরাতে জাহান্নামের উপর দিয়ে পারাপার ইত্যাদি পর্বগুলো শুরু হয়ে যাবে। তখনই হবে মূল প্রদর্শনী। উপস্থিতি এর দুটি অর্থ হতে পারে। প্রতিপালকের সামনে সকল সৃষ্টির উপস্থিতি। এ পর্যায়ে কোন হিসাব নিকাশ থাকবে না। সকলেই শুধু পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান থাকবে। জীন ইনসান পশুপাখি সকল সৃষ্টি আল্লাহর সামনে আসবে। ঠিক যেমন প্রথমবার তিনি সৃষ্টি করেছিলেন কোন কিছু গোপন থাকবে না। আল্লাহ বলেন সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোন কিছু গোপন থাকবে না। অন্য আয়াতে বলেন, তারা আপনার পালনকর্তার সামনে পেশ হবে সারিবদ্ধভাবে এবং বলা হবে তোমরা আমার কাছে এসে গেছো। যেমন তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম। না তোমরা তো বলতে যে আমি তোমাদের জন্য কোন প্রতিশ্রুত সময় নির্দিষ্ট করব না। আমলনামা উপস্থাপন। এই উপস্থিতিতে আমল নিরীক্ষণ চলবে। বান্দাকে জিজ্ঞেস করা হবে প্রেরিত পুরুষদের তোমরা কি উত্তর দিয়েছিলে দুনিয়াতে তোমরা কোন কাজে লিপ্ত ছিলে সে সময়ের উপস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ হবে ভয় পাপ বিছলে যাওয়ার উপক্রম হবে শিশু বৃদ্ধির রূপ নেবে যেহেবা কথা বলতে শুরু করবে আল্লাহ বলেন নিশ্চয় তাদের প্রত্যাবর্তন আমার নিকট এরপর তাদের হিসাব নিকাশ আমারই দায়িত্বে হিসাব অর্থ গণনা করা নিরীক্ষণ করা বিচার দিবস বান্দাদের হিসাব গ্রহণ করা আল্লাহর ন্যায়বিচারের বহির্প্রকাশ সুতরাং যে সৎকর্ম করে আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করেছে পাপিষ্ঠ সীমালঙ্ঘনকারীরা কখনো তাদের সমকক্ষ হতে পারবে না আমল অনুযায়ী মানুষের হিসাব বিভিন্ন রকম হবে কেউ কেউ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে কারো কারো হিসাব সহজ হবে আর কারো কারো হিসাব কঠিন এর মধ্যে যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে চলে যাবে সংখ্যায় তারা 70 হাজার এরা হবে উম্মতের শ্রেষ্ঠাংশ যারা ঈমান তাকওয়া সবর ও জিহাদে অগ্রগামী ছিল তাদের ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম বলেন আমার সামনে সকল উম্মতকে উপস্থাপন করা হলো সেখানে আমার উম্মতকে দেখতে পেলাম তাদের আধিক্য এবং অবস্থা আমাকে মুগ্ধ করল সংখ্যাধিক্যের দরুণ তারা সকল উচ্চস্থান ও পাহাড় ভরে ফেলল আল্লাহ বললেন তুমি সন্তুষ্ট হয়েছো হে মোহাম্মদ তিনি বললেন হ্যাঁ হে আমার প্রতিপালক আল্লাহ বললেন তাদের সঙ্গে আরো 70 হাজার বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা সেসব লোক যারা চিকিৎসার জন্য ঝাড়ফুঁক গ্রহণ করতো না এবং আরোগ্য লাভের আশায় দেহকে দগ্ধ করতো না। এ কথা শুনে রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন হে আল্লাহর রাসূল দোয়া করুন আমি যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই। নবীজি দোয়া করলেন হে আল্লাহ তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এরপর অন্য একজন বলল আমার জন্য দোয়া করুন যেন আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হই। তখন নবীজি বললেন ওকাশা তোমার আগে বলে ফেলেছে। মোট কথায় 70 হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের কোন হিসাব গ্রহণ করা হবে না। তাদের মত তাদের আমল নিরীক্ষণ হবে না। আল্লাহ আমাদেরকে সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করুন। এর মধ্যে যাদের আল্লাহ হিসাব নেবেন ঠিক তবে কোনরূপ নিরীক্ষণ ব্যতীত অত্যন্ত সহজভাবে সেরে ফেলবেন। অল্প কিছু আমল উপস্থাপন করেই তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনের নিকটবর্তী হয়ে তাকে রহমতের ডানা দিয়ে ঢেকে বলবেন তোমার কি অমুক অমুক গুনাহের কথা মনে আছে? সে বলবে হ্যাঁ হে প্রতিপালক শেষ পর্যন্ত যখন সে তার সকল গুনাহের স্বীকারক্তি দেবে মনে মনে ভাববে যে সে ধ্বংস হয়ে গেছে তখন আল্লাহ বলবেন দুনিয়াতে তোমার এই অপরাধগুলো আমি গোপন রেখেছিলাম আর আজ এগুলো ক্ষমা করে দিলাম এরপর তাকে সৎকর্মের আমলনামা দেয়া হবে এজন্য বেশি করে দোয়া করা হে আল্লাহ আমার হিসাব সহজ করে দিন যেমনটি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামকে কোন কোন নামাজে যে দোয়া পড়তে শুনেছি হে আল্লাহ আমার হিসাব সহজ করে দিন। নামাজ থেকে ফেরার পর জিজ্ঞেস করলাম হে আল্লাহর নবী সহজ হিসাব কি? উত্তরে বললেন আমলনামার দিকে তাকিয়ে ছেড়ে দেয়া ক্ষমা করে দেয়া। এর মধ্যে কারো কারো হিসাব অত্যন্ত কঠিন হবে। অপরাধের দরুণ লাঞ্চিত অপদস্ত করা হবে। সকল কাজ নিরীক্ষণ করা হবে। কেন তুমি নামাজে অবহেলা করতে? কিভাবে যাকাত আদায় করতে? পিতা-মাতার অবাধ্য হয়েছিলে কেন? বান্দার হক নষ্ট করেছিলে কেন? এ ধরনের হিসাব গ্রহণকৃত ব্যক্তিদেরকে শাস্তির মুখোমুখী করা হবে। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন যাকে হিসাবের সম্মুখীন করা হবে তাকেই শাস্তি দেয়া হবে। এ কথা শুনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ কি বলেনি? যাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে তার হিসাব নিকাশ সহজ হয়ে যাবে? উত্তরে নবীজি বললেন, এতো হলো উপস্থাপন। তবে যারই কৃতকর্ম নিরীক্ষণ করা হবে তাকেই শাস্তি দেওয়া হবে। এর মধ্যে গুনাহের আধিক্য, বড়ত্ব, স্থায়ী অভ্যাস, নিয়তে গরমেল এ সকল কারণে তাদের হিসাব দীর্ঘ এবং কঠিন করা হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে সে হলো শহীদ। তাকে উপস্থিত করে তার উপর আল্লাহর কৃত অনুগ্রহগুলো জানিয়ে দেয়া হবে। সকল অনুগ্রহ সে স্বীকার করে নেবে। প্রতিপালক বলবেন এতসব অনুগ্রহ পেয়ে তুমি কি করেছো? সে বলবে আমি আপনার জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছি। প্রতিপালক বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি যুদ্ধ করেছ যেন তোমাকে সাহসী বীর বলা হয়। আর সেটা দুনিয়াতেই তোমাকে বলা হয়ে গেছে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের আদেশ করা হলে চেহারায় টেনে হিজড়ে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। অপর ব্যক্তি যে শরীয়তের জন্য শিখে অন্যকে শিখিয়েছে এবং কোরআন পড়েছে তাকে উপস্থিত করে তার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ গুলো জানিয়ে দেয়া হবে। সকল অনুগ্রহ সে স্বীকার করে নেবে। তখন জিজ্ঞেস করা হবে এত সব অনুগ্রহ পেয়ে তুমি কি আমল করেছ? সে বলবে আমি জ্ঞান শিখে অন্যকে শিখিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কোরআন পাঠ করেছি। প্রতিপালক বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এজন্য শিখেছো যেন তোমাকে আলিম বলা হয়। কোরআন পড়েছো যেন তোমাকে কারী বলা হয়। আর দুনিয়াতে তোমাকে সেটা বলা হয়ে গেছে। তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের আদেশ হলে চেহারায় টেনে হিজড়ে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। অপর ব্যক্তি যাকে আল্লাহ রিজিকের প্রশস্ততা দান করেছেন। অনেক সম্পদ দিয়েছেন তাকে উপস্থিত করে তার উপর কৃত আল্লাহর অনুগ্রহ গুলো জানিয়ে দেয়া হবে। সকল অনুগ্রহের কথা সে স্বীকার করে নেবে। প্রতিপালক বলবেন এতসব পেয়ে তুমি কি আমল করেছ? সে বলবে যত পন্থায় আপনি দান করতে বলেছেন সকল পন্থায় আমি আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করেছি। প্রতিপালক বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি এজন্য দান করতে যেন তোমাকে দানবীর বলা হয়। আর দুনিয়াতেই তোমাকে সেটা বলা হয়ে গেছে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের আদেশ করা হলে চেহারায় টেনে হেচড়ে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। সকল সৃষ্টি যখন মহান প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে কঠিন সেই দৃশ্য নগ্ন পথ পায়ে হেঁটে চলবে কোন বাহন নেই নগ্ন দেহ কোন বস্ত্র নেই খতনাবিহীন অবস্থায় ঠিক যেমনিভাবে প্রথমবার সৃজিত হয়েছিল সে এক মহা ত্রাসপূর্ণ সুদীর্ঘ দিবস দুশ্চিন্তায় সেদিন সীমালঙ্ঘনকারীদের দৃষ্টি উপরে উঠে যাবে পাপিষ্ঠদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে অহংকারীরা চরম লাঞ্ছনার শিকার হবে অত্যাচারীরা ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে আল্লাহ বলেন, জালেমরা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো বেখবর মনে করবেন না। তাদেরকে তো তিনি ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন যেদিন চক্ষু সমূহ বিস্ফরিত হবে। তারা মস্তক উপরে তুলে ভীত বেহুবল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে। অন্য আয়াতে বলেন, আপনি তাদেরকে আসন্ন দ্বীন সম্পর্কে সতর্ক করুন। যখন প্রাণ কন্ঠাগত হবে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে ভূপৃষ্ঠ পরিবর্তিত হয়ে যাবে পর্বতমালা চূর্ণ করে দেয়া হবে আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে গ্রহ নক্ষত্রগুলো নিষ্প্রভ হয়ে যাবে উপগ্রহ সমূহ খসে পড়বে সমুদ্রগুলোকে উত্তাল করে আগুনে রূপান্তরিত করা হবে সূর্য আলোহীন হয়ে পড়বে সকল ফেরেশতা ভীতবিহ বল থাকবে সবাই সেদিন মহাবিচারালয়ে দাঁড়াবে কেয়ামতের সে বিচারালয়ে সেদিন সূর্যকে অতি নিকটভবর্তী করা হবে। আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর সেই পরিস্থিতি হবে চরম ভীতিকর। সেই বিচারালয়ে সকল অপরাধী উপস্থিত থাকবে। সকল সাক্ষীর সমাবেশ ঘটবে। আমলনামা উন্মুক্ত হবে। অজুহাত পেশ করার কোন সুযোগ থাকবে না। অন্তর সমূহ প্রকম্পিত থাকবে। যেহেবা সকল কৃতকর্মের স্বীকারোক্তি দেবে। আল্লাহ বলেন, ওইদিনকে ভয় করো যেদিন তোমরা আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। এরপর প্রত্যেকেই তার কর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবে না। কোরআন হাদিস গবেষণা করে সেদিনের হিসাব গ্রহণের গতিপয়ে মূলনীতি আবিষ্কার করা যায়। প্রথম মূলনীতি আমাদের প্রতিপালক হলেন ন্যায়বিচারের অধিপতি। কারো প্রতিবিন্দুমাত্র অবিচার করবেন না। আল্লাহ বলেন এরপর পরিপূর্ণভাবে পাবে প্রত্যেকে যা সে অর্জন করেছে। আর তাদের প্রতি কোন অন্যায় করা হবে না। অন্য আয়াতে বলেন নিশ্চয় আল্লাহ কারো অধিকারে বিন্দুমাত্র অবিচার করেন না। অন্য আয়াতে বলেন যে ব্যক্তি পুরুষ হোক অথবা নারী যদি সৎকর্ম করে এবং বিশ্বাসী হয় তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রাপ্য তেল পরিমাণও নষ্ট হবে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন আল্লাহ বলেন হে আমার বান্দাগণ নিশ্চয়ই অবিচারকে আমি নিজের জন্য হারাম করেছি তোমাদের জন্য তা নিষিদ্ধ করেছি সুতরাং তোমরা পরস্পর অবিচার করো না হে আমার বান্দাগণ তোমাদের প্রত্যেকেই পথভ্রষ্ট তবে যাকে আমি পথ দেখাই সুতরাং আমার কাছেই পথ প্রদর্শন প্রার্থনা করো অবশ্যই আমি তোমাদের পথ দেখাবো হে আমার বান্দাগণ তোমাদের প্রত্যেকেই ক্ষুধার্থ তবে যাকে আমি খাদ্য দান করি। সুতরাং আমার কাছে খাদ্য প্রার্থনা করো। অবশ্যই তোমাদের আমি খাদ্য দেব। হে আমার বান্দাগণ তোমাদের প্রত্যেকেই নগ্ন। তবে যাকে আমি বস্ত্র দান করি। সুতরাং আমার কাছে বস্ত্র প্রার্থনা করো। আমি তোমাদেরকে বস্ত্র দেব। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা দিন-রাত অপরাধ করতে থাকলেও আমি তোমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেব। সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অবশ্যই আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেব। হে আমার বান্দাগণ, কখনো তোমরা আমার কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না, এবং কোন উপকারও করতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীন ইনসান সকলেই যদি তোমাদের সর্বাধিক তাকওয়া বিশিষ্ট লোকের মত হয়ে যায় তবে এর দ্বারা আমার রাজত্বে কিছুই বৃদ্ধি পাবে না। হে আমার বান্দাগণ, পূর্ববর্তী পরবর্তী জীন ইনসান সকলে যদি তোমাদের অতি নিকৃষ্ট পাপিষ্ঠের মত হয়ে যায়, তবে এর দ্বারা আমার রাজত্বে বিন্দুমাত্র হ্রস পাবে না। হে আমার বান্দাগণ তোমাদের পূর্ববর্তী পরবর্তী জিন ইনসান সকলে যদি একটি বিশাল সমতল ভূমিতে একত্রিত হয়ে আমার কাছে চায় আর আমি যদি সকলের চাওয়া পূরণ করি এর দ্বারা আমার বিন্দুমাত্র হ্রাস পাবে না তবে এতটুকুই সমুদ্রের পানিতে সুচ প্রবেশ করালে সুচের অগ্রভাগে পানি জমাট হয়ে সমুদ্র থেকে যতটুকু হ্রাস পায় হে আমার বান্দাগণ তোমরা যা আমল করবে তা আমি সংরক্ষণ করে রেখে দেব এরপর তা তোমাদেরকে প্রতিদানস্বরূপ পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেব। প্রতিদানে যে উত্তম কিছু পায় সে যেন আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করে। ভিন্ন কিছু পেলে কেবল নিজেকে যেন তিরস্কার করে। দ্বিতীয় মূলনীতি অন্যের অপরাধ কেউ বহন করবে না। হ্যাঁ এটি হলো ন্যায়বিচারের বহির প্রকাশ। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। আল্লাহ বলেন যে ব্যক্তি কোন গুনাহ করে তা তারই দায়িত্বে থাকে। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। অন্য আয়াতে বলেন, যে কেউ সৎপথে চলে সে নিজের মঙ্গলের জন্যই সৎপথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের অমঙ্গলের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ বলেন তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মুসার কিতাবে এবং ইব্রাহিমের কিতাবে সে তার দায়িত্ব পালন করেছিল। কিতাবে এই আছে যে কোন ব্যক্তি অপরাধের গুনাহ নিজে বহন করবে না আর মানুষ তাই পায় যা সে করে তার কর্ম শীঘ্রই দেখা হবে এরপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে তৃতীয় মূলনীতি বান্দাদেরকে তাদের সকল কৃতকর্ম জানিয়ে দেয়া হবে পালনকর্তার কাছে কোন কিছুই গোপন নয় আমলনামায় ভালোমন্দ সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকবে কেয়ামতের দিন সবকিছুই নিজের সামনে দেখতে পাবে আল্লাহ বলেন সেদিন প্রত্যেকে যা কিছু সে ভালো কাজ করেছে চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তা ওরা তখন কামনা করবে যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দূরের হতো অন্য আয়াতে বলেন তখন প্রত্যেকে জেনে নেবে সে কি অগ্রে প্রেরণ করেছে এবং কি পশ্চাতে ছেড়ে এসেছে অন্যত্র বলেন তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে আপনার পালনকর্তা কারো প্রতি জুলুম করবেন না প্রত্যেককে কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করা হবে তাদের আমলনামার মাধ্যমে। আমলনামা পড়ে সে বুঝতে পারবে আল্লাহ বলেন, আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার কৃপালগ্ন করে রেখেছি। কেয়ামতের দিন বের করে দেখাবো তাকে একটি কিতাব যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ করো তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট। উক্ত আমলনামায় ছোট বড় সকল কৃতকর্মের বিবরণ থাকবে। আল্লাহ বলেন, আর আমলনামা সামনে রাখা হবে। তাতে যা আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে ভেতর সন্ত্রস্ত দেখবেন। তারা বলবে হায় আফসোস এ কেমন আমলনামা। এযে ছোট বড় কোন কিছুই বাদ দেয়নি সবই এতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারো প্রতি জুলুম করবেন না। চতুর্থ মূলনীতি অসৎ কর্মফল নয়। সৎকর্মফল বাড়িয়ে দেয়া হবে। এটি হবে বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে সীমাহীন দয়া ও করুণার বহির প্রকাশ। শান্তি ও আজাব প্রদান অপেক্ষা দয়া ও ক্ষমায় আল্লাহর অধিক পছন্দ। ফলে বান্দার সৎকর্মে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তার আরো বাড়িয়ে দেবেন। তবে অসৎকর্মফল তিনি ঘৃণা করেন ঠিক। তবে তা বৃদ্ধি করবেন না। হয়তো ক্ষমা করবেন নয়তো শাস্তি দেবেন। আল্লাহ বলেন, যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করো তিনি তোমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। সৎকর্মফল বৃদ্ধির সর্বনিম্ন রূপ হল 10 গুণ। আল্লাহ বলেন যে একটি সৎকর্ম করবে সে তার 10 গুণ পাবে। পক্ষান্তরে অসৎকর্মফলের প্রতিদান হবে সমান। আল্লাহ বলেন এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে সে তার সমান শাস্তি পাবে। বস্তুত্ব তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম আপন প্রতিপালক থেকে বর্ণনা করে বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক অসীম দয়ালু। যে সৎ কাজের ইচ্ছে করে কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেনি তাকে একটি পুরস্কার দেয়া হয়। আর যদি বাস্তবায়ন করে তবে তার জন্য 10টি থেকে 700 অথবা ততধিক সংখ্যা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। পক্ষান্তরে যে অসৎ কাজের ইচ্ছা করে কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি তার জন্য কোন গুনাহ নেই। এমনকি সেই কাজ পরিত্যাগের তরুণ তার জন্য একটি পুরস্কার লিপিবদ্ধ হয়। আর যদি করে ফেলে তবে একটি গুনাহ লেখা হয় অথবা আল্লাহ তা মিটিয়ে দেন। এত কিছুর পরও যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে সেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ভাষ্য আল্লাহ বলেন যে ব্যক্তি সৎকর্ম করবে তার জন্য 10 গুণ বা ততধিক আমি বৃদ্ধি করে দেব। আর যে অসৎকর্ম করে তার প্রতিদান সমান বা তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ যদি শিরক না করে ভূপৃষ্ঠ ভর অপরাধ নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হয় আমি তার অন্য আমি তার জন্য অনুরূপ ক্ষমা নিয়ে আসবো। কেউ আমার দিকে এক হাত আগে বাড়লে আমি তার দিকে এক গজ বেড়ে যাব। কেউ আমার দিকে এক গজ অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দুই গজ এগিয়ে যাব। কেউ আমার দিকে হেঁটে আসলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাব। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট দয়া ও মহানুভবতার বহির প্রকাশ যে তিনি সৎকর্মফলগুলো 10 থেকে সাত শত গুণ বা ততধিক পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহ বলেন যারা আল্লাহর পথে নিজের ধন সম্পদ ব্যয় করে তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় প্রত্যেকটি শীষে 100 করে দানা থাকে। আল্লাহ অতিদানশীল সর্বজ্ঞ পঞ্চম মূলনীতি সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা কেয়ামতের দিন বান্দার কৃতকর্মের সাক্ষী তার সাথেই থাকবে দুনিয়াতে যে সকল বস্তু সর্বদা তার সঙ্গে অবস্থান করত বান্দা এগুলোকে সাক্ষী মনে করতো না প্রহরী ফেরেশতাবৃন্দ লিপিকার ফেরেশতাদয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হ্যা এগুলোই তার পক্ষে বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ বলেন প্রস্তুত যে কোোন অবস্থাতেই তুমি থাকো এবং কোরআনের যে কোোন অংশ থেকে পাঠ করো কিংবা যেকোনো কাজই তোমরা করো। অথচ আমি তোমাদের নিকটে উপস্থিত থাকি। যখন তোমরা তাতে আত্মনিয়োগ করো। আর তোমার প্রতিপালক থেকে গোপন থাকে না একটি কণাও। না জমিনের এবং না আসমানের। না এর চেয়ে ক্ষুদ্র কোন কিছু আছে। না বড় যায় প্রকৃষ্ট কিতাবে নেই। অন্যত্র বলেন নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সবকিছু প্রত্যক্ষ করেন। পাশাপাশি নবী রাসূলগণ এবং অন্যান্য সৃষ্টিও সাক্ষী হবেন। আল্লাহ বলেন আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডেকে আনবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারী রূপে। আল্লাহ আরো বলেন প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একজন সাক্ষী আলাদা করব। এরপর বলব তোমাদের প্রমাণ আনো। আল্লাহ বলেন প্রত্যেক ব্যক্তি আগমন করবে তার সাথে থাকবে চালক ও কর্মের সাক্ষী সে তার উপর কৃত সকল কর্মের সাক্ষ্য দেবে সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে দিন-রাত তারা উভয়ে তাদের মাঝে কৃত আমলের সাক্ষ্য দেবে অর্থসম্পদ কোত থেকে অর্জন করেছে এবং কি কাজে ব্যয় করেছে সে সম্পর্কে সম্পদ সাক্ষ্য দেবে ফেরেশতা ব্যক্তির সকল কর্মের সাক্ষ্য দেবে বান্দা যদি এগুলোর কোন একটি অস্বীকার করে কেয়ামতের ময়দানে কোন কোন কোন লোক আমলনামায় লিখিত বিষয়কে অস্বীকার করবে মনে করবে এসব তারা করেনি বান্দা যখন অতি বাড়াবাড়ি করবে সাক্ষীদের মিথ্যারোপ করবে তখন আল্লাহ তার মুখ বন্ধ করে দেবেন অঙ্গপ্রত্যঙ্গই তখন তার সকল কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে কি ভয়াবহ হবে সেই দৃশ্য হাত বলবে আমার দ্বারা সে হারাম বস্তু স্পর্শ করেছে বা বলবে আমাকে ব্যবহার করে সে হারাম কাজে এগিয়েছে চোখ বলবে আমার মাধ্যমে সে নিষিদ্ধ বস্তু দেখেছে কান বলবে আমার সাহায্যে সে হারাম শুনেছে এভাবে নাক চামড়া সঙ্গই তার বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে হে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন আমাদের দোষ ত্রুটি গোপন করুন আল্লাহ বলেন আজ আমি তাদের মুখে মোহর এটে দেব তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে আবু মুসা আশারী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন কাফের মুনাফিককে কেয়ামতের দিন হিসাবের জন্য ডাকা হবে প্রতিপালক তার সামনে কৃতকর্ম কর্ম প্রকাশ করলে সে সামনাসামনি অস্বীকার করে বলবে হে প্রতিপালক আপনার মর্যাদার শপথ এ ফেরেশতা আমার বিরুদ্ধে লিখেছে আমি এগুলো করিনি ফেরেশতা বলবে তুমি অমুকদিন অমুক কাজটি করোনি সে বলবে না হে প্রতিপালক এরপর তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গই তখন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে একথা বলে তিনি উপরিক্ত আয়াত পাঠ করেছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন বান্দা বলবে হে প্রতিপালক জুলুম থেকে আমাকে রেহাই দেবেন না প্রতিপালক বলবেন অবশ্যই সে বলবে আজ আমি শুধু আমার ভেতর থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করব প্রতিপালক বলবেন তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য আজ তুমি যথেষ্ট লিপিকার ফেরেশতাও আছে তোমার সাথে তারপর তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে অঙ্গ সমূহকে বলা হবে বল এরপর অঙ্গগুলো তার সকল কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে এরপর কথা বন্ধ করে দিয়ে বলা দূর হয়ে যাও। তোমার সাথে আমি বিবাদ করেছিলাম। আল্লাহ বলেন, তারা যখন জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে তখন তাদের কানে চক্ষু ও তক তাদের কর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। যেসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে এবং তাদেরকে থামাও তারা জিজ্ঞাসিত হবে। এভাবে আল্লাহ কোরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন, মানুষকে তার কৃতকর্ম, তার ইচ্ছা, তার কথাবার্তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। কোরআন হাদিসে যে সকল বিষয়ে জিজ্ঞেস করার বিবরণ এসেছে আল্লাহর নিকট সর্ববৃহৎ অপরাধ হলো বান্দা কোন সৃষ্টিকে তার সমকক্ষ সাভ্যস্ত করা শিরকের অপরাধ কখনো আল্লাহ ক্ষমা করবেন না আল্লাহ বলেন নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না যে লোক তার সাথে শরিক করে তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে সে যেন অপবাদ আরোপ করল সকল অংশীদারকৃত বস্তু সেদিন নিজেদেরকে তাদের উপাসনা থেকে মুক্ত ঘোষণা করে আল্লাহর কাছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। আল্লাহ বলেন তাদেরকে বলা হবে তারা কোথায়? তোমরা যাদের পূজা করতে আল্লাহর পরিবর্তে তারা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে অথবা তারা প্রতিশোধ নিতে পারে? অন্যত্র বলেন যেদিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন তোমরা যাদেরকে আমার শরী মনে করতে তারা কোথায়? আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে জবাইকৃত জন্তু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন, তারা আমার দেয়া জীবন উপকরণ থেকে তাদের জন্য একটি অংশ নির্ধারণ করে যাদের কোন খবরই তারা রাখে না। আল্লাহর কসম তোমরা যে অপবাদ আরোপ করছো সে সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। জিজ্ঞেস করা হবে রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ সম্পর্কে। আল্লাহ বলেন, যেদিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বলবেন, তোমরা রাসূলগণকে কি জবাব দিয়েছিলে? এরপর তাদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। দুনিয়াতে কৃত তাদের ভালোমন্দ আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন অতএব আপনার পালনকর্তার কসম আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করব তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে। হ্যাঁ। ধনী গরীব রাজা-বাদশা আরব অনারব শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ স্বাধীন কৃতদাস সকলে জিজ্ঞাসিত হবে। এমনকি রাসূলদেরকেও নিজ নিজ সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সম্প্রদায়কে তাদের রাসূল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আল্লাহ বলেন, অতএব আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রাসূল প্রেরিত হয়েছিল এবং আমি অবশ্যই জিজ্ঞেস করব রাসূলগণকে। এরপর আমি সজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা করব। বস্তুত আমি অনুপস্থিত তো ছিলাম না। আর সেদিন যথাযথ ওজন হবে। তারপর যাদের পাল্লা ভারি হবে তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা এমন হবে যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা তারা আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করতো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন কেয়ামতের দিন চারটি বিষয়ে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত কারো পা সামান্য পরিমাণ নড়বে না। তার বয়স সে তা কোন কাজে নিঃশেষ করেছে? তার জ্ঞান সে অনুপাতে কতটুকু আমল করেছে? তার সম্পদ কোত্থেকে উপার্জন আর কোথায় খরচ করেছে? তার দেহ কি কাজে তা খর্ব করেছে প্রশস্ত বাড়ি দ্রুতগামী গাড়ি সুস্বাধু খাদ্য ও শীতল পানীয় কোমল পোশাক সেবক সেবিকা পরিতৃপ্তি সুঠাম বলিষ্ঠ দেহ সুখময় নিদ্রা এমনকি পানকৃত মধু সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করা হবে আল্লাহ তাআলা বলেন অবশ্যই সেদিন তোমরা নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম বলেন কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মানুষকে নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে বলা হবে তোমাকে কি সুস্থ সবল দেহ দেইনি তোমার জন্য শীতল পানীয় ব্যবস্থা করিনি কোন নিয়ামতকে ছোট মনে করা উচিত নয় এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করল আমরা কি দরিদ্র মহাজির ছিলাম না উত্তরে আব্দুল্লাহ বললেন তোমার কি কোন স্ত্রী আছে সে বলল হ্যাঁ তিনি বললেন থাকার মত বাড়ি আছে বলল হ্যাঁ বললেন তবে তো তুমি ধনী সে বলল একজন খাদেমও আছে আমার বললেন তবে তো তুমি বাদশা বান্দা যত বেশি সামর্থ্যবান হবে তত বেশি তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ বলেন নিশ্চয় কান চক্ষু অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটি জিজ্ঞাসিত হবে। কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন না দেখে কখনো দেখেছি বলো না। না শুনে কখনো শুনেছি বলো না। না জেনে কখনো জেনেছি বলো না। কারণ এ সবকিছু সম্পর্কেই তুমি জিজ্ঞাসিত হবে। সুদীর্ঘকাল মানুষ অপেক্ষমান থাকবে। সকলের মনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করবে। তাদের সামনে জাহান্নাম প্রদর্শন করা হবে। নবীগণ পর্যন্ত ভয়ে থাকবেন। ওগণ অস্থির থাকবেন। মুমিনগণ পেরেশান হয়ে যাবেন। অপিষ্ঠরা ঘামের পুকুরে হাবুডুবু খেতে থাকবে। কেয়ামতের সেই সুদীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে হিসাব কার্য শুরু হবে। শেষ নবীর প্রতি দয়া ও তার উম্মতকে মর্যাদা দিতে গিয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের হিসাব শুরু করবেন। যেমনটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, আমরা সর্বশেষ জাতি এবং আমাদের হিসাবে সর্বাগ্রে গৃহীত হবে। লাল হবে উম্ম জাতি এবং তার নবী কোথায়? সুতরাং আমরা সর্বশেষে এসেছি সর্বাগ্রে থাকব। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম আরো বলেন, দুনিয়াবাসীর মধ্যে আমরাই সর্বশেষ জাতি। কিন্তু কেয়ামতের দিন আমরা সর্বাগ্রে থাকবো। সকল সৃষ্টির পূর্বে আমাদের হিসাব নিকাশ শুরু হবে। অন্যের অধিকারে সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো অন্যায়ভাবে তার রক্ত প্রবাহিত করা। বর্তমানকালে অস্ত্রশস্ত্র সহজলভ্য হওয়ায় খোনাখুনি ও হত্যাযজ্ঞ বেড়েই চলেছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম একে কেয়ামতের নিদর্শন বলে আখ্যা দিয়েছেন। কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না হত্যাযজ্ঞ বেড়ে যায়। রক্তের অধিকার সবচেয়ে বড় অধিকার। তাই সর্বপ্রথমে বিষয়ের হিসাব শুরু হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে বিষয়ের ফয়সালা হবে তা হলো রক্তের অধিকার। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম আরো বলেন, কেয়ামতের দিন এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে এসে বলবে হে প্রতিপালক সে আমাকে হত্যা করেছিল। আল্লাহ বলবেন কেন তুমি তাকে হত্যা করেছিলে? সে বলবে এজন্য হত্যা করেছি যেন সম্মান একমাত্র আপনার জন্যই হয়। প্রতিপালক বলবেন মর্যাদা একমাত্র আমার জন্যই। অপর ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে এসে বলবে হে প্রতিপালক সে আমাকে হত্যা করেছিল। আল্লাহ বলবেন কেন তুমি তাকে হত্যা করেছিলে? সে বলবে যেন অমুকের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। প্রতিপালক বলবেন মর্যাদা তার জন্য নয়। এরপর তার জন্য অপরাধ সাব্যস্ত হয়ে যাবে। প্রতিটি মানুষের উচিত রক্তের অপরাধ থেকে দূরে থাকা। ঝগড়া বিবাদ প্রাণহানি মারামারি পরিত্যাগ করা। ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিচার দিবস একটি সুদীর্ঘ ও কঠিন দিবস। তবে আল্লাহ যার জন্য সহজ করে দেন মানুষের অবস্থা হবে সেদিন বিভিন্ন রকম। মহা প্রতাপশালী আল্লাহর সামনে সেদিন সকলে ভীত সন্ত্রস্ত থাকবে। একে অন্যকে চিনতে চাইবে না। পরস্পর বংশ ভুলে যাবে। আল্লাহ বলেন, তারপর যখন সিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। বন্ধুত্ব যতই গভীর হোক, সম্পর্ক যতই পুরনো হোক কেয়ামতের দিন একে অপরকে চিনতে চাইবে না। সকলেই নিজের পরিণাম নিয়ে চিন্তিত থাকবে। আল্লাহ বলেন, সেদিন বন্ধু বন্ধুর খবর নেবে না। সেদিন মানুষ তার পরিবার ও বন্ধুদের থেকে পলায়ন করবে। ভাই বোন থেকে দূরে থাকবে। সকল ক্ষমতার অবসান ঘটবে। সকল প্রতাপশালী সেদিন চরম লাঞ্ছনার শিকার হবে। সেই চিরঞ্জীব চিরস্থায়ী সত্তার সামনে সব মুখমন্ডল অবনিমিত হবে এবং ব্যর্থ হবে যে জুলুমের বোঝা বহন করবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রাসূলগণ ছাড়া সেদিন কেউই কথা বলার সাহস পাবে না। সেদিন সকলেই তার কৃতকর্ম হাতের সামনে উপস্থিত পাবে। আল্লাহ বলেন সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভালো কাজ করেছে চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও ওরা তখন কামনা করবে যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দূরের হতো আল্লাহ তার নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করেছেন। আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। আল্লাহ বলেন, আমি মৃতদেরকে জীবিত করি এবং তাদের কর্ম ও কীর্তিসমূহ করি। আমি প্রত্যেক বস্তু স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি। এভাবেই প্রতিপালক মানুষের অবস্থা এবং তাদের রেখে যাওয়া কৃতকর্ম সংরক্ষণ করেছেন। প্রতিটি বস্তুর যথাযথ হিসাব সেদিন নেয়া হবে। দুনিয়াতে যা সে করেছে কোরআনের জ্ঞান শিখেছে এবং প্রচার করেছে সেবামূলক কাজ করেছে নলক স্থাপন করেছে নদী বা পুকুর খনন করেছে এতিমকে লালন পালন করেছে জ্ঞানের প্রচার প্রসার করেছে অথবা সুসন্তান রেখে গেছে এ সবগুলোই মৃত্যুর পর তার জন্য সদকায়ে জারিয়ার উপকরণ হবে পক্ষান্তরে যেকোন হারাম বস্তু রেখে গেছে যেমন মধ্যশালা নিত্যাঘার অশ্লীল টিভি চ্যানেল অথবা অথবা মিথ্যা উপকথার সম্বলিত পুস্তক। তবে এসবে মৃত্যুর পর তার জন্য গুনাহ সরবরাহের উপকরণ হবে। হাশরের ময়দানে সবকিছুই সে তার সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে। আল্লাহ বলেন, সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে সে যা সামনে প্রেরণ করেছে ও পশ্চাত্য ছেড়ে দিয়েছে। বরং মানুষ নিজেই তার নিজের চক্ষুমান। যদিও সে তার অজুহাত পেশ করতে চাইবে। যে ব্যক্তি কোন গুনাহকে ছোট মনে করলো কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তা বড় করে দেখবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন তোমরা ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থেকো। কেননা তার উদাহরণ হলো ওই দলের ন্যায়। যারা একটি উপত্যকায় অবস্থান করল সবাই ছোট ছোট লাকড়ি এনে জমা করলো অথপর লাকড়িগুলো দিয়ে তারা রুটি পাক করে ফেল। ছোট গুনাহের জন্য যদি কাউকে ধরে ফেলা হয় তবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। হক অধিকার আদায় বলতে কোন বস্তু তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। মানুষের জন্য আল্লাহ হক ধার্য করেছেন। আল্লাহ নিজের জন্য কিছু অধিকার ধার্য করেছেন। উভয় প্রকার অধিকারে যদি বিন্দুমাত্র গর্ব করা হয় তবে সেজন্য জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে। বান্দাদের উপর আল্লাহর হক হলো তারা কেবল তারই এবাদত করবে। তার সঙ্গে কাউকে শরিক সাব্যস্ত করবে না। প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত আদায় করবে। অন্যান্য ইবাদতগুলো সযত্নে আদায় করবে। কেয়ামতের দিন প্রথম প্রশ্নই হবে দুনিয়াতে তোমরা কিসের এবাদত করতে? রাসূলদের আহ্বানে তোমরা কতটুকু সাড়া দিয়েছিলে? এবাদত সময়ের মধ্যে সর্বপ্রথম হিসাব হবে নামাজের। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম হিসাব হবে নামাজের। নামাজের হিসাব ঠিক থাকলে ব্যক্তি সফলকাম হয়ে যাবে। নামাজে গ্রেফতার হলে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তবে যদি সামান্য ঘাটতি থাকে তবে প্রতিপালক বলবেন দেখো বান্দার কোন নফল এবাদত আছে কিনা থাকলে সেগুলো দিয়ে ফরজ নামাজের ক্ষতিগুলো পূরণ করা হবে এরপর অন্য সব আমলের হিসাব হবে আল্লাহ মানুষের একে অন্যের উপরও কিছু হক নির্দিষ্ট করেছেন। পিতার কিছু হক রয়েছে সন্তানের উপর। সন্তানের কিছু হক রয়েছে পিতার উপর। প্রতিবেশীর কিছু হক রয়েছে। স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক হক রয়েছে। এমনকি জীবজন্তুর প্রতিও কিছু হক রয়েছে। বান্দাদের হকের ক্ষেত্রে কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম হিসাব হবে রক্তের অধিকার। সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যের হাতে নিহত হলো বা সুরিকার খাতে আহত হলো এর বিচারী হবে সর্বপ্রথম। যেমনটি পূর্বক্ত হাদিসে আমরা শুনে এসেছি মানুষকে প্রহার করে অভ্যস্ত এ ধরনের ব্যক্তিদের থেকে তারা প্রহারের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, অন্যায়ভাবে যাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। কেয়ামতের দিন সে এর বদলা গ্রহণ করবে। নবীজি আরো বলেন কোন লোক যদি অপর কোন লোককে প্রহার করে তবে কেয়ামতের দিন তার থেকে অনুরূপ প্রতিশোধ নেয়া হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের সম্মানিত স্ত্রী উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন একথা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম আমার ঘরে ছিলেন। তার হাতে ছিল মেসওয়াক। তিনি ছোট সেবিকাকে ডাকছিলেন। কয়েকবার ডাকার পর রাগান্বিত হয়ে গেলেন। অনন্তর উম্মে সালমা ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলেন সে জন্তুর সাথে খেলা করছে। বললেন নবীজি তোমাকে ডাকছেন। আর তুমি এখানে জন্তু নিয়ে খেলা করছো। সে নবীজির কাছে এসে বলল, ওই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন আমি শুনতে পাইনি। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, কেয়ামতের দিন প্রতিশোধের ভয় না থাকলে আমি মেসওয়াক দিয়ে তোমাকে ব্যথিত করতাম। মানুষের হক কখনো বৃধা যাবে না। আল্লাহ তাআলা সকলকে নিজ নিজ অধিকার বুঝিয়ে দেবেন। এমনকি তা সামান্য হলেও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, কেউ যদি অপর ভাইয়ের উপর অবিচার করে থাকে তবে আজই যেন সে তা শুধরে নেয়। সেদিন আসার পূর্বেই যেদিন দিরহাম দিনার থাকবে না। সৎকর্ম থাকলে অবিচার অনুপাতে কেটে নেয়া হবে। অন্যায়কৃত অপরাধের বোঝা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। অবশ্যই পাওনাদার আখেরাতে তার পাওনা যথাযথভাবে বুঝে নেবে। হয়তো সৎকর্মফল নিয়ে নেবে অথবা অসৎকর্মফলের বোঝা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে। দুনিয়ার স্বর্ণ মুদ্রা ও রোপ্য মুদ্রা সেখানে কোন কাজে আসবে না। কোন পুরুষ বা মহিলার প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা এ ধরনের অপরাধীকে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তি প্রদান করা হবে। এমনকি ক্রীতদাসের উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করলে কেয়ামতের দিন তার উপর জিনার দন্ড কার্যকর করা হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি তার কৃতদাসকে জিনার অপবাদ দিল বাস্তবে এমনটি না হলে কেয়ামতের দিন তার উপর জিনার দন্ড বেত্রাঘাত কার্যকর হবে। শক্তি ক্ষমতা প্রভাব বা পদাধিকারের অপব্যবহার করে গরীব দুঃখী ব্যক্তিদের নিপীড়নে অভ্যস্তদের থেকে কেয়ামতের দিন প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে এক ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর সামনে বসে বলতে লাগলো হে আল্লাহর রাসূল আমার কিছু কৃতদাস রয়েছে তারা আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমার অবাধ্যতা করে ফলে আমি তাদের গালমন্দ করি তাদেরকে প্রহার করি এতে কি আমার কিছু হবে নবীজি উত্তরে বললেন যতটুকু তারা তোমার অবাধ্য হয়েছে মিথ্যারোপ করেছে অবিশ্বাসঘাতকতা করেছে ততটুকু তাদের থেকে হিসাব নে হবে। আর তাদের প্রতি তোমার শাস্তি যদি অপরাধ অনুপাতে হয়ে থাকে তবে তাতে তোমার কোন সমস্যা হবে না। তবে যদি মাত্রাতিরিক্ত শাস্তি দিয়ে থাকো তবে অতিরিক্ত শাস্তির প্রতিশোধ তোমাকে কেয়ামতের দিন পেতে হবে। এ কথা শুনে ব্যক্তি হাওমাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করল। আল্লাহর রাসূল বললেন, তুমি কি আল্লাহর গ্রন্থ পাঠ করো না? আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণ হয় আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্যে আমি যথেষ্ট। তখন ব্যক্তিটি বলল এখন তাদেরকে স্বাধীন করে দেয়াটাই আমার জন্য শ্রেয় মনে করি। আপনাদের সাক্ষী রেখে বললাম আজ থেকে তারা সকলেই স্বাধীন। এই হলো অবিচারের পরিণাম। অবশ্যই তা থেকে আমাদের বিরত থাকা উচিত। অবিচার কেয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে। পরম সুবিচারের বহির্প্রকাশ হলো কেবল মানুষের পারস্পরিক নয় বরং জীবজন্তুদের পারস্পরিক অন্যায় অবিচারের প্রতিশোধও তিনি গ্রহণ করবেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন অবশ্যই সকল অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। এমনকি শিংবাহী ছাগল থেকে সিংবিহীন ছাগল দুনিয়াতে কৃত আঘাতের পরিবর্তে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। দুনিয়াতে কেউ যদি জীবজন্তুকে কষ্ট দিয়ে থাকে তবে আখেরাতের বদলা নেয়া হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, এক নারী বিড়ালকে আটকে রেখে কষ্ট দিয়েছিল। বিড়ালটি ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করলে এর পরিবর্তী নারী জাহান্নামী হয়েছিল। আটক রেখে সে তাকে খাদ্য দেয়নি, পানি দেয়নি, জমিন থেকে আহার করতে ছেড়েও দেয়নি। এটি হলো আল্লাহ তাআালার ন্যায় পরায়ণতার সর্বোচ্চ ধাপ। সকলের প্রাপ্যই তিনি যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেবেন। কেয়ামতের দিন পুরো ময়দান প্রতিপালকের নূর দ্বারা আলোকিত হবে। সৃষ্টির বিচারকার্য সমাধা করতে তিনি নূর ছড়িয়ে দেবেন। নবী ও শহীদদেরকে নিয়ে আসা হবে। আল্লাহ বলেন পৃথিবী তার পালনকর্তার নূরে উদ্ভাসিত হবে। আমলনামা স্থাপন করা হবে। নবী ও সাক্ষীগণকে আনা হবে এবং সকলের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে। তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না। স্বয়ং আল্লাহ সর্বপ্রথম মানুষের আমল জানিয়ে দেবেন। তিনি প্রধান সাক্ষী। কোন কিছুই তার থেকে গোপনীয় নয়। আল্লাহ বলেন তোমরা যা করছো তা তিনি প্রত্যক্ষ করছেন। নবী রাসূলদেরকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির প্রতি রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন। তারা মানুষকে সুসংবাদ দিয়েছেন এবং ভীতি প্রদর্শন করেছেন। কেউ তাদের কথা শুনেছে আবার কেউ তাদের প্রতি মিথ্যারোপ করেছে। কেয়ামতের দিন সকল সৃষ্টি যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে আল্লাহর ভাষ্য। অতএব আমি অবশ্যই তাদেরকে জিজ্ঞেস করব যাদের কাছে রাসূল প্রেরিত হয়েছিল। এবং আমি অবশ্যই রাসূলদেরকে জিজ্ঞেস করব। এরপর আমি সজ্ঞানে তাদের কাছে অবস্থা বর্ণনা করব। বস্তুত আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। বিভিন্ন সম্প্রদায় যখন তাদের কাছে আগত রিসালাতকে অস্বীকার করবে তখন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম ও তার উম্মত সেই নবী রাসূলদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। আল্লাহ বলেন, যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানব মন্ডলের জন্যে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন নূহকে ডাকা হবে। তিনি উপস্থিত হে প্রতিপালক বলবেন জিজ্ঞেস করা হবে তুমি কি বাণী পৌঁছিয়েছিলে বলবেন হ্যাঁ তার উম্মতকে জিজ্ঞেস করা হবে তিনি কি তোমাদেরকে বাণী পৌঁছিয়েছেন তারা বলবে আমাদের কাছে কোন ভীতি প্রদর্শনকারী আসেনি প্রতিপালক বলবেন তোমার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে হে নূহ তিনি বলবেন মোহাম্মদ তো তার উম্মত এরপর তোমরা তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে এটি হলো আল্লাহর বাণীর মর্মার্থ এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানব মন্ডলের জন্যে। সুতরাং উম্মতে মুহাম্মদী হলো কেয়ামতের দিন সকল মানুষের উপর সাক্ষী। অন্য বর্ণনায় উম্মতে মুহাম্মদী সকল নবীদের পক্ষে তাদের সম্প্রদায়ের উপর সাক্ষ্য দেবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহ সাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন একজন নবী আসবেন যার অনুসারী কেবল একজন। আরেকজন আসবেন যার অনুসারী কেবল দুজন বা ততধিক। এরপর তাদের সম্প্রদায়কে ডেকে বলা হবে সে কি তোমাদের কাছে বাণী পৌঁছায়নি? তারা বলবে না বলা হবে কে তোমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে নবী বলবে মোহাম্মদও তার উম্মত এরপর উম্মতে মোহাম্মদীকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে সে কি আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছে সকলেই বলবে হ্যাঁ প্রতিপালক বলবেন তোমরা কি করে বুঝলে তারা বলবে আমাদের নবী আমাদেরকে অবহিত করেছেন যে নবীগণ আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়েছেন আর আমরা নবীর কথা সত্যায়ন করেছি তিনি সাক্ষ্য দেবেন যে আল্লাহর বাণী তিনি উম্মতের কাছে পৌঁছিয়েছেন। তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। সকল কল্যাণকর বিষয়ের সংবাদ শুনিয়েছেন। সকল অনিষ্ট থেকে তাদেরকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন, আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারী রূপে। উম্মতের প্রতি নবীজির দয়া ও সহনশীলতার বহির প্রকাশ হলো। তিনি কেয়ামতের সেই সাক্ষ্যের বিষয়টি স্মরণ করে কেঁদেছিলেন। এমনকি অতিক্রমের ফলে তার দাড়ি ভেজে উঠেছিল। তার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। একদিন তার নিকট আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বসেছিলেন। তিনি বললেন, আমাকে কোরআন পড়ে শোনাও। ইবনে মাসউদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার উপরেই তো কোরআন অবতীর্ণ হয়। আমি আপনাকে পড়ে শোনাবো। নবীজি বললেন, আমি অন্যের থেকে কোরআন শোনা পছন্দ করি। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এরপর আমি সূরা নিসার কিছু অংশ পাঠ করে এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলাম। আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে? যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারী রূপে। নবীজি বললেন ব্যাস আমি নবীজির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার দু চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। কি পরিমাণ দয়া ও ভালোবাসা ছিল তার সে উম্মতের প্রতি। সুতরাং উম্মত হিসেবে আমরা যেন তার সেই সুধারণা রক্ষা করি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে তাকেও খুশি করে তুলি। এরপর সকল নবী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জন্য সাক্ষী হয়ে আসবেন। তারা আপন সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর এবং শিরকের পরিণাম থেকে তাদেরকে সতর্ক করার পক্ষে সাক্ষী দেবেন। আল্লাহ বলেন প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে আমি একজন সাক্ষী আলাদা করব। অতঃপর বলব তোমাদের প্রমাণ আনো। তখন তারা জানতে পারবে যে সত্য আল্লাহর এবং তারা যা গড়ত তা তাদের কাছ থেকে উধাও হয়ে যাবে। আয়াতে সাক্ষী বলতে নবীগণ উদ্দেশ্য। প্রহরী ফেরেশতাগণ কখনোই মানুষের থেকে পৃথক হন না। জাগ্রত অবস্থায় বা নিদ্রায় সর্বক্ষণ তারা আমল সংরক্ষণের কাজে ব্যস্ত। ব্যক্তির সকল কথা ও কাজ তারা সংরক্ষণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে কোন কাজই তোমরা করো। আমি তোমাদের নিকট উপস্থিত থাকি। কেয়ামতের দিন তারা বান্দার জন্য সাক্ষী দেবে। কত নামাজ সে পড়েছে, কতবার সে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছে। কতবার কোরআন পাঠ করেছে, এমনকি মানুষ নিজের বিরুদ্ধেও সাক্ষ্য দেবে। জমিন তার উপর কৃত আমল সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। নামাজী ব্যক্তির সম্পর্কে নামাজের সাক্ষ্য দেবে। মুজাহিদদের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। পাশাপাশি ব্যভিচারের ব্যভিচার সম্পর্কেও সাক্ষ্য দেবে। চোরে চুরি বলে দেবে। খুনির খুন ফাঁস করে দেবে। অপরাধীদের সেদিন পালায়নের কোন উপায় থাকবে না। আল্লাহ বলেন সেদিন সে তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে। কারণ আপনার পালনকর্তা তাকে আদেশ করবেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম উপরযুক্ত আয়াত পাঠ করে বলতে লাগলেন তোমরা কি জানো জমিনের বৃত্তান্ত বর্ণনা কি? সবাই বলল আল্লাহ ও তার রাসূলে অধিক জানেন। বললেন তার বৃত্তান্ত বর্ণনা হলো প্রত্যেক স্বাধীন ও কৃতদাস তার বুকে কি কি কাজ করেছে সেগুলো প্রকাশ করা। সে বলবে অমুক আমার উপর অমুক দিন অমুক কাজ করেছে। নবীজি আরো বলেন তোমরা জমিনকে সংরক্ষণ করো। কারণ তা হলো তোমাদের মা সাদৃশ্য। মানুষ তার উপর যত কাজ করেছে কেয়ামতের দিন সে সকল কাজের সাক্ষ্য দেবে। একদিন পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। তার সামনে দাঁড়াতে হবে। কথা জানার পরও মানুষ কি করে অপরাধে লিপ্ত হয়। যে চোখ দিয়ে সে দেখেছে, যে কান দিয়ে সে শুনেছে, যে হাত দিয়ে সে স্পর্শ করেছে, যে পা দিয়ে হেঁটে চলেছে, এমনকি দেহের চামড়াও একদিন সাক্ষ্য দেবে। তেমনি পেট, পেট, গোছা, উড়ু ইত্যাদিও। আল্লাহ বলেন, আজ আমি তাদের মুখে মোহর এটে দেব। তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, যেদিন প্রকাশ করে দেবে তাদের জেহবা, তাদের হাত ও তাদের পা যা কিছু তারা করতো। আনসার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম এর কাছে ছিলাম। তিনি হেসে দিয়ে বললেন, তোমরা কি বুঝতে পারছো কেন আমি হাসছি? বললাম আল্লাহ তার রাসূলে অধিক জানেন। বললেন আল্লাহর সাথে বান্দার সংলাপ নিয়ে। বান্দা বলবে হে প্রতিপালক আপনি কি আমাকে অবিচার থেকে মুক্তি দেবেন না? প্রতিপালক বলবেন অবশ্যই। সে বলবে আজ আমি নিজের ভেতর ছাড়া অন্য কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করবো না। এরপর প্রতিপালক বলবেন তোমার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আজ তুমি যথেষ্ট। পাশাপাশি তোমার সাথে আছে লিপিকার ফেরেশতা। তারপর তার মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বলা হবে বল। এরপর অঙ্গ সমূহ তার কৃতকর্মের বিবরণ তুলে ধরবে। এরপর পুনরায় কথা বলার অনুমতি দেয়া হলে সে নিজের অঙ্গ সমূহকে লক্ষ্য করে বলবে ধিক তোদের। তোদের বাঁচানোর জন্যই তো আমি মিথ্যা বলছিলাম। তোদেরকে আগুন থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। অন্য হাদিসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম কেয়ামতের দিন বান্দাদের প্রশ্নোত্তর পর্বের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন এরপর তৃতীয় জন অনুরূপ বলতে থাকবে বলবে হে প্রতিপালক আমি আপনার প্রতি আপনার কিতাব সময়ের প্রতি আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাসী ছিলাম দুনিয়াতে আমি নামাজ পড়েছি রোজা রেখেছি যাকাত আদায় করেছি এভাবে যতগুলো পারবে বলবে প্রতিপালক বলবেন এখানে এসেও মিথ্যা বলছো এরপর বলা হবে এখন আমাদের পক্ষের সাক্ষী বের করব এমন সময় সে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করতে থাকবে। কে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে। এরপর তার মুখে মোহর এটে দেয়া হবে। উরু মাংসহারকে বলা হবে সাক্ষ্য দাও। এরপর এগুলো তার কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। এ হল মুনাফিক। এ হল মিথ্যাবাদী। নিজের সম্পর্কে সে অজুহাত পেশ করছে। এ হল সে যার উপর প্রতিপালক অসন্তুষ্ট হয়েছেন। পাথর ও বৃক্ষকূলের সাক্ষ্য। এগুলো কেয়ামতের দিন মানুষের পক্ষে বিপক্ষে সাক্ষ্য দেবে। মুয়াজ্জিনের জন্য আযানের সাক্ষ্য দেবে। হাদিসে আছে মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি যতদূর পর্যন্ত পৌঁছায় ততদূর পর্যন্ত যত জিন ইনসান এবং বস্তু আছে সকলে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। হাশরের ময়দানে মানুষের কৃতকর্ম পরিমাপের জন্য পাল্লায় স্থাপন করা হবে। পরিমাপ করা হবে প্রতিফল প্রদানের জন্য। আমল ওজনের ধাপ শুরু হবে প্রশ্নোত্তর ও হিসাব নিকাশ সমাপ্ত হওয়ার পর। কারণ হিসাব নিকাশ হলো আমলের প্রতিদান নির্ধারণের জন্য। আর পরিমাপ হলো আমলের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য। যেন পরিপূর্ণ প্রতিফল সাব্যস্ত হয়। বিন্দুমাত্র তার্তম্যের কোন সম্ভাবনা না থাকে। আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারীমে মিজান উল্লেখ করে তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিতে মানুষকে আদেশ করেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিজানের বর্ণনা দিয়ে তাতে ভারী ও হালকা আমল সমূহ সম্পর্কে উম্মতকে অবহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয় আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমি যথেষ্ট। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন এরপর যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই হবে সফলকাম আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি সাধন করেছে তারা দোযোখেই চিরকাল বসবাস করবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন দুটি বাক্য উচ্চারণে অতি সহজ তবে মিজানে অনেক ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছেও বাক্য প্রিয় আমরা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতার গুণগান করছি। মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর পায়ের দুই গোছা সম্পর্কে নবীজি বলেছিলেন, ওই দুটি পা মিজানে ওহুদ পর্বত অপেক্ষা ভারী হবে। সামনে বিস্তারিত বিবরণ আসছে। কোরআন হাদিসের বর্ণনা সমূহে চিন্তা করলে স্পষ্ট বুঝে আসে যে মিজান হবে প্রকৃত মানদন্ড। পরিমাপ করার জন্য একটি কবজা ও দুটি পাল্লা থাকবে। একটি ভারী হলে অপরটি হালকা হয়ে যাবে। তবে এর আয়তন সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বর্ণিত হয়নি। এর সঠিক আয়তন সম্পর্কে আল্লাহ ব্যতীত কেউ অবগত নয়। তবে সেটি হবে বিশাল এক মানদন্ড। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কেয়ামতের দিন মিজান স্থাপন করা হবে। সকল আসমান ও জমিন যদি তাতে পরিমাপ করতে হয় করা যাবে। ফেরেশতাগণ বলবেন হে প্রতিপালক কার জন্য পরিমাপ হবে? আল্লাহ বলবেন আমার সৃষ্টি থেকে যার জন্য ইচ্ছা তখন ফেরেশতাগণ বলবেন আমরা আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি সত্যিই আমরা আপনার যথাযথ উপাসনা করতে পারিনি পরম সুবিচারের বহির্প্রকাশ মানুষের ছোট বড় সকল কৃতকর্ম সেখানে উত্তোলন হবে আল্লাহ বলেন আমি কেয়ামতের দিন ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব সুতরাং কারো প্রতি জুলুম হবে না যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমাণ হয় আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমি যথেষ্ট। পরিমাপকৃত বস্তু কি মানুষের কৃতকর্ম? আমলনামা নাকি সে নিজেই। ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো সবগুলোই পরিমাপযোগ্য। বিভিন্ন হাদিসের প্রমাণ পাওয়া যায়। কতিপয় হাদিসে মানুষের কৃতকর্ম পরিমাপের কথা বলা হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, দুটি বাক্য উচ্চারণ অতি সহজ। তবে মিজানে অনেক ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছে বাক্য দুটি প্রিয়। সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম। আমরা আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতার গুণগান করছি। মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। অন্যত্র নবীজি বলেন, আল্লাহর প্রশংসা পাঠ মিজানকে ভরে দেবে। মানুষের ভালোমন্দ কৃতকর্মের বর্ণনা সম্বলিত আমলনামা পরিমাপ হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালেমায়ে শাহাদাত লিখিত কাগজ মিজানে স্থাপন সংক্রান্ত হাদিসের মধ্যে বলেন এক ব্যক্তি কেয়ামতের দিন সকল সৃষ্টির সামনে চিৎকার করতে থাকবে এরপর তার বিপক্ষে 99 টি সংরক্ষিত তালিকা উন্মুক্ত করা হবে প্রতিটি তালিকা দৃষ্টি সীমা পরিমাণ দীর্ঘ আল্লাহ বলবেন তুমি এগুলো অস্বীকার করতে পারবে সে বলবে না হে প্রতিপালক বলবেন আমার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ফেরেশতাগণ কি তোমার প্রতি অবিচার করেছে সে বলবে না হে প্রতিপালক প্রতিপালক বলবেন তোমার কিছু বলার আছে তোমার কি কোন নেকি আছে এরপর লোকটি ভয় পেয়ে বলবে না প্রতিপালক বলবেন নিশ্চয়ই তোমার জন্য আমার কাছে একটি নেকি রয়েছে আর আজ তোমার প্রতি অবিচার করা হবে না এরপর একটি কাগজ বের করা হবে যাতে লেখা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সে বলবে হে প্রতিপালক এতগুলো বিশাল তালিকার সামনে এ ছোট্ট চিরকুটের কি বা মূল্য? প্রতিপালক বলবেন, আজ তোমার প্রতি অবিচার করা হবে না। এরপর সবগুলো কাগজ এক পাল্লায় রাখা হবে এবং ছোট্ট চিরকুট অপর পাল্লায় রাখা হবে। তখন দীর্ঘ বিশাল কাগজগুলোর পাল্লা হালকা হয়ে যাবে। আর ছোট্ট চিরকুটের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। আল্লাহর নামের বিপরীতে কোন কিছুই ভারী হতে পারে না। বোঝা গেল মানুষের আমলনামাও পরিমাপ করা হবে। এই হাদিসে বলা হয়েছে একত্ববাদের স্বীকৃতি সকল গুনাহকে মুছে দেয়। যে স্বীকৃতির পর মুরতাদ হওয়ার ভয় থাকে না। ইসলাম থেকে বের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে যদি মুরতাদ হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে তার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সঠিক রূপে বলা হয়নি। এটা করা কেবল একটিমাত্র বাক্য উচ্চারণ ছাড়া কিছু নয়। হাসান বসরী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, মানুষ বলে থাকে, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উত্তরে তিনি বললেন যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে এবং তার সমুদায় অধিকার ও ফরজগুলো আদায় করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বাক্য তখনই জান্নাতে প্রবেশের উপায় হবে যখন এ বাক্যের সমুদায়ের চাহিদা পূরণ করা হবে। মুনাফিকরা যদি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে তাদের কোন কাজে আসবে না। বরং তাদের ঠিকানা জাহান্নামের সর্বনিম্নেই হবে। কারণ তারা শুধু মুখেই বলে অন্তরে বিশ্বাস করে না এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে এর চাহিদাগুলো পূরণ করে না। এভাবে যে ব্যক্তিকে মিজানে উঠানো হলো এরপর তার কৃতকর্ম অনুযায়ী তার পাল্লা ভারী বা হালকা হলো। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ঘটনা সম্মলিত হাদিসে এর বিবরণে এসেছে। তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের সাথে একবার একটি বৃক্ষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম তাকে সে বৃক্ষে উঠে মেসওয়াক বানানোর জন্য একটি ডাল কেটে আনার আদেশ করলেন। ইবনে মাসউদ ছিলেন হালকা দেহ গড়নের। তিনি গাছে উঠে ডাল কাটছিলেন। এমন সময় বাতাস এসে কাপড় সরিয়ে ফেললে তার পায়ের দুই নলা প্রকাশ হয়ে যায়। তার দু পায়ের ছিপছিপে নলা দেখে সবাই হেসে ওঠে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বললেন, তোমরা হাসছো কেন? তার দুই সরু নলা দেখে ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ তার এই সরু দুই পা মিজানে ওহুদ পর্বত অপেক্ষা অধিক ভারী হবে। কোন আমল তার দুই পাকে মিজানে ভারী করে তুলল? নিঃসন্দেহে তা হলো তার দীর্ঘ নামাজ, অধিক পরিমাণে রোজা ইত্যাদি। আর ইবনে মাসউদ ব্যতীত যে সকল ব্যক্তিবর্গ নিজেদের দেহকে সুঠাম ও স্থূলাকায় বানিয়েছে বাজ্যিক আকর্ষণীয় পোশাক পরিধান করেছে কিন্তু অভ্যন্তর রয়ে গেছে কলুষিত তাদের ব্যাপারে নবীজি বললেন নিশ্চয় সুঠাম ও স্থূলাকায় অনেক ব্যক্তি কেয়ামতের দিন দাঁড়াবে আল্লাহর কাছে তারা মশার ডানা পরিমাণ মূল্যায়ন পাবে না এরপর বললেন তোমরা চাইলে পাঠ করো কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি মানদন্ড স্থাপন করব না সুতরাং যার সৎকর্মের পাল্লা ভারি হবে সে জান্নাতে যাবে। আর যার অসৎকর্মের পাল্লা ভারী হবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবে যদি আল্লাহ ক্ষমা করে দেন অথবা তার ব্যাপারে সুপারিশকারীদের সুপারিশ গ্রহণ করেন আল্লাহ বলেন আর সেদিন যথাযথই অর্জন করা হবে এরপর যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম হবে। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারা এমন হবে যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা তারা আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করত। ব্যক্তি চাই কাফের হোক বা মুসলিম কারো প্রতি আল্লাহ বিন্দু পরিমাণ অবিচার করবেন না। অনেক কাফেরের আমল ওজনই করা হবে না। আল্লাহ বলেন তারাই সে লোক যারা তাদের পালনকর্তার নির্দেশনাবলী এবং তার সাথে সাক্ষাতের বিষয় অস্বীকার করে। ফলে তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যায়। সুতরাং কেয়ামতের দিন তাদের জন্য আমি কোন গুরুত্ব স্থির করবো না। কাফেরদের কৃতকর্ম দুই প্রকার। যারা সীমালঙ্ঘন করেছে এবং দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে তাদের সকল কৃতকর্ম পরিত্যাজ্য হবে। মূলত কৃতকর্ম সম্পাদনকালেই তারা কোন ফলাফল আশা করেনি। তাদের এসব কৃতকর্মকে আল্লাহ অন্ধকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন, অথবা তাদের কর্ম উত্তাল সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়। যাকে উদ্দিলিত করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ। যার উপরে ঘন কালো মেঘ আছে। একের উপর এক অন্ধকার। যখন সে তার হাত বের করে তখন সেটি একেবারে দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না তার কোন জ্যোতিই নেই। দ্বিতীয় প্রকার দুনিয়াতে তারা পরকালে লাভের আশায় যেসব সৎ কাজ করেছে যেমন সাদাকা আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা অত্যাচারীদের সহায়তা জনসেবামূলক কাজ এর বিনিময় তাকে দুনিয়াতে দিয়ে দেয়া হবে। হয়তো তাদের ধনসম্পদ বাড়িয়ে দেয়া হবে। আত্মাপ্রশান্ত করা হবে। অসুস্থতা দূর করা হবে। কষ্ট লাঘব করা হবে অথবা বিপদ দূর করা হবে। তবে পরকালে তার এসব কর্ম কোন উপকারে আসবে না। কারণ আমল কবুল হওয়ার একমাত্র শর্ত হলো আল্লাহর প্রতি ঈমান। তারপরও আল্লাহর কাছে সৎ ও অসৎ কাফের এক নয়। তাইতো দুনিয়াতেই তাদের সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্যই কামনা করে হয় আমি দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করব না। এরাই হলো সেসব লোক আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছুই নেই। তারা এখানে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে। আর যা কিছু উপার্জন করেছিল সবই বিনষ্ট হলো। আল্লাহ তাদের কৃতকর্মের কিছু দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। মরিচিকা সদৃশ্য কারণ তারা এসব কাজের বিনিময়ে প্রতিদান আশা করে। অথচ প্রতিদানে এরা কিছুই পাবে না। তার দৃষ্টান্তই পিপাসার্ত ব্যক্তির ন্যায় যে মরিচিকাকে পানি মনে করে। আল্লাহ বলেন, যারা কাফের তাদের কর্ম মরুভূমির মরিচিকা সদৃশ্য। যাকে পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি মনে করে। এমনকি সে যখন তার কাছে যায় তখন কিছুই পায় না। এবং পায় সেখানে আল্লাহকে। এরপর আল্লাহ তার হিসাব চুকিয়ে দেন। আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। লাকড়ি আগুনে পড়ে যাওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তাকে ছাই এবং কয়লা বলা হয়। কাফেরদের আমল সেই ছায়ের নামান্তর যা সামান্য বাতাসে বিক্ষিপ্ত হয়ে উড়ে যায়। আল্লাহ বলেন যারা শিয় পালনকর্তার সত্তার অবিশ্বাসী। তাদের অবস্থা এই যে তাদের কর্মসমূহ ছাইভসের মত যার উপর দিয়ে প্রবল বাতাস বয়ে যায়। থলিঝড়ের দিন তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের করতলগত হবে না। এটাই দূরবর্তী পথভ্রষ্টতা। আমল যতই আল্লাহর প্রিয় হবে ততই মিজানে তা ভারী হবে। আর মিজানে সৎকর্মের পাল্লা ভারী হলেই সে চির সফলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আমলের মধ্যেও আবার কিছু প্রকার রয়েছে। ছোট বড় সওয়াব কম, সওয়াব বেশি, হালকা ভারী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম মিজানে অতি ভারী কিছু আমলের কথা বলে গেছেন। যেমন উত্তম চরিত্র, সহজ একটি গুণ, হাস্যজ্জ্বল চেহারা এবং নরম কথা। যাদেরকে চরিত্রবান করা হয়েছে সর্বদা মুচকি হাসি যাদের চেহারায় লেগে থাকে এবং যাদের শিষ্টাচার ভালো। মিজানে তাদের আমল সবচেয়ে ভারী হবে। দয়াময় আল্লাহর কাছেও সে অতি প্রিয় সাভ্যস্ত হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তার আখলাক ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা তার চরিত্রের প্রশংসা করে বলেন, আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী। অন্য আয়াতে আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয়ের হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয়ী হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। সৎচরিত্রের প্রশংসায় নবীজি বলেন কেয়ামতের দিন মিজানে সবচেয়ে ভারী হবে উত্তম চরিত্র ইতর ও অশিষ্ট লোকেরা আল্লাহর ঘৃণার পাত্র আল্লাহর জিকির অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির ও তাসবি তাহলিল মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয় যে যাকে ভালোবাসে তার স্মরণ বা আলোচনা সে বেশি পরিমাণ করে সুতরাং যে আল্লাহকে ভালোবাসবে আল্লাহর স্মরণও সে বেশি বেশি করবে আল্লাহ বলেন তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও জিকিরকারী নারী তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শ্রেষ্ঠ আমল প্রতিপালকের কাছে সবচেয়ে খাঁটি স্তর বৃদ্ধিকারী এবং স্বর্ণরূপাদান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আমল সম্পর্কে কি আমি তোমাদেরকে বলব? তাছাড়া এটি যুদ্ধে শত্রুদের শিরোচ্ছেদ বা তোমাদের শাহাদাত বরণ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট আমল। সবাই বলল বলুন হে আল্লাহর রাসূল বললেন তা হলো আল্লাহর জিকির। এক ব্যক্তি এসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামকে জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহর রাসূল ইসলামের বিধি-বিধান আমার কাছে অধিক মনে হচ্ছে। নির্দিষ্ট কোন আমল বলে দিন। যার উপর আমি অবিচল থাকবো। নবীজি বললেন, তোমার জিহবা যেন সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকে। মিজানে জিকির অনেক ভারী হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, দুটি বাক্য উচ্চারণে অতি সহজ। তবে মিজান অনেক ভারী এবং দয়াময় আল্লাহর কাছে বাক্য দুটি প্রিয়। সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি। সুবহানাল্লাহিল আজিম। আমরা আল্লাহর প্রশংসা পবিত্রতার গুণগান করছি। মহান আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। জিকির হলো আলহামদুলিল্লাহ বলা। মিজানে তো অনেক ভারী হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। আলহামদুলিল্লাহ মিজানকে ভরে দেয় সুবহানাল্লাহ এবং আলহামদুলিল্লাহ আসমান জমিনের মধ্যস্থল পূর্ণ করে দেয় আল্লাহর রাস্তায় কিছু ওয়াকফ করা ওয়াকফ হলো সম্পদের নির্দিষ্ট কোন অংশ যেমন জমি প্রতিষ্ঠান বা ফসলের ক্ষেত ইত্যাদি আল্লাহর রাস্তায় নির্দিষ্ট করে দেয়া সুতরাং তা আর কেউ বিক্রি করতে পারবে না তা থেকে উপার্জিত সমুদায় অর্থ সেবামূলক কাজে ব্যয় হবে আর এটি সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন বলেন, মানুষ মরে গেলে তিনটি ব্যতীত তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। সদকায়ে জারিয়া তার রেখে যাওয়া জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং সুসন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মৃত্যুর পর মুমিনের যে সকল আমল তার সঙ্গে মিলিত হবে। জ্ঞান যা সে শিখিয়েছে এবং প্রচার করেছে। সুসন্তান যা সে রেখে এসেছে। কোরআন যা সে উত্তরাধিকারীদের জন্য ছেড়ে এসেছে। মসজিদ যা সে নির্মাণ করেছে। ঘর যা সে পথিক মুসাফিরদের জন্য তৈরি করেছে। নদীপুকুর যা সে প্রবাহিত খনন করেছে। সাদকায়ে জারিয়া যা সে সুস্থ অবস্থায় নিজের সম্পদ থেকে বের করে দান করেছে। সর্বশেষ সাথে থাকবে তার মৃত্যু পরবর্তী জীবন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস এবং তার প্রতিশ্রুতি সত্যায়ন করে আল্লাহর রাস্তায় যে একটি ঘোড়া পালন করবে তাকে আহার দান পানি পান করানো তার বিষ্ঠা এবং প্রস্রাব সবকিছুই কেয়ামতের দিন সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে। এসব বর্ণনার দ্বারা ওয়াকফের ফজিলত উপলব্ধি করা যায়। আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনার আনসারীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ছিল মসজিদে নববীর পাশেই বাইরোহা নামক একটি নিজস্ব খেজুর বাগান। ছিল মসজিদের ঠিক কেবলার দিকে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম সেখানে ঢুকতেন এবং সেখান থেকে পানি পান করতেন। এরপর যখন আয়াত নাযিল হলো, কশ্চিনকালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না। যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না করো। তখন আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু উঠে নবীজির কাছে গিয়ে বললেন আল্লাহ তার কালামে বলেছেন কশ্চিন কালেও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না যদি তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে তোমরা ব্যয় না করো আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় হলো এই বায়রুহা খেজুর বাগান আজ থেকে এটি আল্লাহর জন্য দান করে দিলাম এর প্রতিদান ও পুরস্কার কেবল আল্লাহর কাছ থেকেই আমি আশা করি সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল একে আপনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করুন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বললেন হ্যাঁ এটি সর্বাধিক লাভযোগ্য বস্তু এটি সর্বাধিক লাভযোগ্য বস্তু। তুমি যা বলেছ আমি শুনেছি। আমি মনে করি এই বাগানকে তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের কল্যাণে দিয়ে দাও। এরপর আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু গিয়ে তার আত্মীয় এবং চাচাতো ভাইদের মধ্যে সেটি ভাগ করে দিয়ে দিলেন। ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খাবারে গনিমতের বন্টনে কিছু জমি পেয়েছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের কাছে এসে পরামর্শ চেয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, খাইবারে আমার কর্তৃত্বে কিছু জমি আছে। এরকম মূল্যবান সম্পদ আমি আর কোন সময় পাইনি। এগুলো আমি কি করব? আল্লাহর রাসূল বললেন, চাইলে মূলটা রেখে বাকিটা দান করে দিতে পারো। এরপর ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তা দান করে দিলেন। ফলে তা আর বিকৃত হয়নি। উত্তরাধিকার বন্টনে আসেনি। দরিদ্র আত্মীয় ক্রীতদাস আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামকারী পথিক ও মেহমানদের জন্য তা বরাদ্ধ করে দিলেন। ন্যায় পথে যে কেউ তা থেকে খেতে পারে। কোন কিছু আল্লাহর জন্য ওয়াকফ করে দেয়া ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিধান। ওয়াকফু মিজানে ভারী পড়বে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেন, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস এবং তার প্রতিশ্রুতি সত্যায়ন করে আল্লাহর রাস্তায় যে একটি ঘোড়া লালন করল তাকে আহার দান, পানি পান করানো তার বেষ্ঠা এবং প্রস্রাব সবকিছুই কেয়ামতের দিন সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত হবে। হাদিসের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুসলিমগণ যেন কোন বস্তু ওয়াকফ হিসেবে রেখে যায়। তা ঘোড়া হোক, জমি হোক, মসজিদ হোক, মাদ্রাসা হোক বা অন্য কিছু যেন এর প্রতিদান সে পরকালে পরিপূর্ণরূপে পায়। বেশি করে নেক আমলের মাধ্যমে মিজানের পাল্লা ভারি করতে মুসলমানদের সচেষ্ট হওয়া উচিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রতিটি সৎকর্ম 10 গুণ থেকে 700 গুণ বা ততধিক পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। অন্য হাদিসে বলেন, যে ব্যক্তি পুণ্যের ইচ্ছা করে তার জন্য একটি নেকি লেখা হয়।
